Blog


এইমস ওয়েব পোর্টাল- কার্যকর উন্নয়ন সহযোগিতার পথে বাংলাদেশের আরেক ধাপ

বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বৈদেশিক সহায়তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বৈদেশিক সহায়তার উপর আমাদের নির্ভরশীলতা অনেক কমে এসেছে, তা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় এক তৃতীয়াংশের সংস্থান করা হয় বৈদেশিক অর্থ সহায়তার মাধ্যমে- যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা হতে প্রাপ্ত ঋণ সহায়তা, অনুদান, কারিগরি সহায়তা ইত্যাদি।

তথ্যের এই অবাধ প্রবাহের যুগে উন্নয়ন সহযোগিতাকে কার্যকর করবার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে উন্নয়ন সহায়তা প্রাপ্তি ও ছাড় প্রক্রিয়াকে অধিকতর স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করা। আর এই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তখনি পালন করা সম্ভব যখন অনলাইনের মাধ্যমে সর্বসাধারণের মধ্যে এতদসংক্রান্ত তথ্যাবলীর দ্রুত ও অবাধ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নাধীন ইউ.এন.ডি.পি. সহায়তাপুষ্ট “Strengthening Capacity for Aid Effectiveness in Bangladesh” শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে একটি ওয়েব পোর্টাল বা তথ্য বাতায়ন-- Bangladesh Aid Information Management System  (বাংলাদেশ এইড ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) বা Bangladesh AIMS (বাংলাদেশ এইমস- http://aims.erd.gov.bd) চালু করা হয়েছে।

এইড ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এইমস হচ্ছে এমন একটি ওয়েবভিত্তিক সফটওয়্যার যার মাধ্যমে বিদেশ থেকে আসা উন্নয়ন সাহায্য সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য ও উপাত্তসমূহ অনলাইনে একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনমত ব্যবহার করা সম্ভব।

এইমস চালু হবার ফলে বাংলাদেশে আসা বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ ও ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য ও উপাত্তসমূহ এইমস ওয়েবসাইট (http://aims.erd.gov.bd) থেকে সংগ্রহ করা যাবে। বিভিন্ন দাতা সংস্থা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, সেক্টর বা অঞ্চল অনুযায়ী  বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পসমূহের প্রতিশ্রুত ও ছাড়কৃত অর্থের পরিমাণ এইমসের মাধ্যমে জানা যাবে। বাংলাদেশ সরকার ও দাতা সংস্থাসমূহ উভয়ই এই সিস্টেমের মাধ্যমে লাভবান হবে।

এখনও পর্যন্ত বিশ্বের ৪০টিরও বেশী দেশে বাণিজ্যিকভাবে তৈরিকৃত এইমস সফটওয়্যার যেমন Development Assistance Database (DAD) এবং Aid Management Platform (AMP) ব্যবহার  করা   হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ হচ্ছে খুবই স্বল্পসংখ্যক দেশগুলোর মধ্যে একটি যারা নিজেরাই তাদের দেশীয় লোকবলের মাধ্যমে এই এইমস সফটওয়্যারটি তৈরি করতে পেরেছে।

বাংলাদেশ এইমস তৈরির প্রথম ধাপে বিশ্বের অন্যান্য দেশে ব্যবহৃত এ ধরনের সফটওয়্যারগুলোর মধ্যে একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা সম্পাদন করা হয়। পর্যালোচনা সাপেক্ষে দেখা যায় যে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়াতে যে এইমস সফটওয়্যারটি ব্যবহৃত হচ্ছে তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যথোপযোগী ও কম খরচ সাপেক্ষ। তবে সাথে সাথে এও দেখা যায় যে কম্বোডিয়াতে ব্যবহৃত এইমস সফটওয়্যারটির মধ্যে কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে ২০১২ সালের আগস্ট মাসে দাখিলকৃত এক প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে কম্বোডিয়ান ডাটাবেসটিকে আরও গভীরভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য আরও আধুনিক ও  যথোপযোগী একটি এইমস সফটওয়্যার তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে এ পর্যায়ে এইমস সফটওয়্যারটির একটি Prototype বা নমুনা তৈরি করা হয় যা স্বার্থসংশ্লিষ্ট  বিভিন্ন পক্ষের কাছে তাদের মতামতের জন্য উপস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন পক্ষের এই মতামতের ভিত্তিতে এরপর Prototype টির আরও কিছু উন্নতি সাধন করা হয়। পরবর্তী ধাপে, এইমস সফটওয়্যারটি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় নকশা-পত্র প্রস্তুত করা হয় এবং সেই নকশা-পত্র মোতাবেক সফটওয়্যারটির নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়। একই সঙ্গে এইমস তৈরিতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদানের জন্য ই আর ডি’র নয়জন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি ফোকাস গ্রুপ তৈরি করা হয়।

এরপর, এইমস নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে সফটওয়্যারটির ইন্টারফেসগুলো ফোকাস গ্রুপের কাছে উপস্থাপন করে তাদের মতামত গ্রহণ করা হয়। এভাবে, ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে এইমসের একটি User Acceptance Test  বা UAT সংস্করণ উপস্থাপন করা হয় যা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনার জন্য এইমস ফোকাস গ্রুপসহ ই আর ডি’র কর্মকর্তাবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের মাঝে উপস্থাপন করা হয়।

এর পরবর্তী ধাপে, এইমস সফটওয়্যারের সাথে ব্যবহারের জন্য কতগুলো Aid Effectiveness Indicator নির্ধারণ করা হয় এবং সেই সাথে এইমসের জন্য একটি পৃথক সার্ভার স্থাপনের কাজও সম্পন্ন করা হয়। সার্বিক প্রস্তুতি সাপেক্ষে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে এইমসের বেটা (BETA) সংস্করণ চালু করা হয়। এ পর্যায়ই সর্বপ্রথম এইমসের ওয়েব পোর্টালটি অনলাইনে আংশিকভাবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

এরপর এইমসের এই বেটা সংস্করণটি নিয়ে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনার জন্য ই আর ডি, দাতা সংস্থা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পক্ষের সাথে একাধিক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। একই সাথে এইমস পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দাতা সংস্থার কর্মকর্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করা হয়। এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে অচিরেই বিভিন্ন দাতা সংস্থাগুলো এইমসে রেজিস্ট্রেশন ও তথ্য সরবরাহের কাজ শুরু করে।

এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ২০১৪ সালের ২৬ শে অক্টোবর এইমস ওয়েব পোর্টালটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আবদুল মুহিত রাজধানীর এন ই সি মিলনায়তনে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বৈদেশিক সহায়তা বিষয়ক ওয়েব পোর্টালের শুভ উদ্বোধন করেন। সেই সাথে আমাদের জাতীয় অঙ্গনে উন্নয়ন সহযোগিতার কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে এবং বৈদেশিক সহায়তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা রক্ষায় যোগ হয় একটি নতুন মাত্রার।

উল্লেখ্য যে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার স্বার্থে International Aid Transparency Initiative বা IATI এর কোডিং অনুসরণ করে এই সফটওয়্যারটি নির্মাণ করা হয়েছে । এছাড়া নির্মাণের সময় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দাতা সংস্থাসমূহ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা ও মত বিনিময় করা হয়েছে।

এইমসে তথ্য সরবরাহের জন্য বাংলাদেশে কর্মরত যেকোনো দ্বিপাক্ষিক বা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাকে এইমসে রেজিস্ট্রেশন করে নিতে হয়। সে লক্ষে, এখন পর্যন্ত ১৭ টি দাতা সংস্থা এইমসে রেজিস্ট্রেশন করেছে। তার মধ্যে বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা, ইউ কে এইড, নেদারল্যান্ডস, ইউ এস এইড, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সহ বেশ কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইতোমধ্যে এইমসে তথ্য সরবরাহের কাজ শুরু করেছে।

আশা করা যায় যে, এইমস বৈদেশিক সহযোগিতার সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে। বিশেষত বৈদেশিক সহায়তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং এর স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তাছাড়া, অদূর ভবিষ্যতে দেশের জাতীয় বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে এই এইড ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম খুবই সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, দাতা সংস্থাগুলোর উন্নয়ন সহযোগিতা প্রক্রিয়াকে দেশের সার্বিক উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।

Blog post Projects Asia & the Pacific Bangladesh Development Effectiveness Aid UNDP

UNDP Around the world

You are at UNDP Bangladesh 
Go to UNDP Global